);

শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ০৩:৩৯ পূর্বাহ্ন

নোটিশ :
cht-breakingnews.com এ আপনাকে স্বাগতম। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার বেটা ভার্ষণ চলছে......
ব্রেকিং নিউজ :
খাগড়াছড়িতে কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ৩জনের স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি পার্বত্যমন্ত্রীর সাথে সন্তু লারমার বৈঠক বৌদ্ধ পূর্ণিমা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রাঙামাটির পুলিশ রাঙামাটির হাসপাতালগুলোতে শূন্যপদে দ্রুত লোক নিয়োগের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি রাঙামাটি শহরে সিএনজিতে ফেলে যাওয়া যাত্রীর ৫ লক্ষ টাকার চেক ফিরিয়ে দিলেন অটোরিক্সা চালক ফনী মোকাবেলায় জেলা প্রশাসকের প্রস্তুতিমূলক সভা; দুর্যোগকালীন জরুরি ভিত্তিতে সেবা পেতে ফোন নম্বরগুলো হলো.. আমাকে মেরে যদি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দাবি পূরণ হয়, তাহলে তাদের বুলেট আমি হাসি মুখে বরণ করবো- শহীদুজ্জামান মহসিন রোমান রাঙামাটিতে টিভি কাপ উন্মুক্ত নাইট সার্কেল ক্রিকেট টুর্নামেন্টের শুভ উদ্বোধন নানিয়ারচর জোন কমান্ডারের বিদায় ও নবাগত জোন কমান্ডারের পরিচিতি উপলক্ষে মত বিনিময় সভা রক্তদান কর্মসুচীর উদ্বোধন মধ্যদিয়ে রাঙামাটিতে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস পালন
পাহাড়ে সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর উত্থান ও সন্ত্রাসীমূলক কার্যক্রম এবং বর্তমান পরিস্থিতি

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে থেকে শুরু করে প্রতিবেদনে

পাহাড়ে সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর উত্থান ও সন্ত্রাসীমূলক কার্যক্রম এবং বর্তমান পরিস্থিতি

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের কাছে অস্ত্র জমা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)’র
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের কাছে অস্ত্র জমা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)’র

শাহ আলম, সিএইচটি ব্রেকিং নিউজ ডট কম, রাঙামাটি (বিশেষ প্রতিবেদন)। পাহাড়ের রাজনীতিতে অস্ত্রের ঝনঝনানিতে রক্তাক্ত পার্বত্য অঞ্চল। এ যেন এক রক্তের হলি খেলায় মেতে উঠেছে পাহাড়ের রাজনীতি। অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর আধিপত্য বিস্তারের জেরে পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্তে রঞ্জিত হয়ে, অশান্ত হয়ে পড়েছে সুবজ পাহাড়। আঞ্চলিক দলগুলোর স্বার্থের দ্বদ্বে আর প্রাণঘাতি সংঘাতে একের পর এক সংগঠনের জন্ম । আর এসব সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামের অঞ্চলকে আরো সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে যাচ্ছে। আঞ্চলিক দলগুলোর বেপোয়ারা হওয়ার পিছনে আন্তজার্তিক শক্তির মদদ রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

বর্তমানের পাহাড়ের রাজনীতিতে দিন দিন যেমন ঘটছে পরিবর্তন, তেমনি রাজনীতির মেরুকরণে সবুজ পাহাড়ে ঝরছে রক্ত। একাত্তরের পর থেকেই আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর জন্য পাহাড়ে নিয়তই রক্ত ঝরছে। প্রথমত আঞ্চলিক সংগঠনগুলেরার নিজেদের অধিকার আদায়ে শান্তি বাহিনী গঠনের মাধ্যমে গেরিলা আক্রমণ শুরুর পর পাহাড়ে রক্তযুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধ প্রতিনিয়ত রূপ পরিবর্তন হয়ে এখনো ঝরছে। তবে এখন নিজেদের অধিকার আদায় আর গেরিলা আক্রমণ নয়; নিজেদের আধিপত্য লড়াইয়ে একে-অন্যকে প্রতিনিয়ত খুন করছে। আর দিন দিন পাহাড়ের মানুষের মধ্যে বাড়ছে দূরত্ব।

আশির দশকের পূর্বে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান তিন জেলা নিয়ে একটি জেলা ছিল। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে পার্বত্য আসনে তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। পরে যদিও সেই সময়ের স্বতন্ত্র বিজয়ী প্রার্থী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এমএন লারমা) বাকশালে যোগ দেন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম জঘন্য ঘটনা বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর পরই সারাদেশের মতো বদলে যেতে শুরু করে পাহাড়ের রাজনীতি।

পাহাড়ের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিতে এমএম লারমার নেতৃত্বে গঠিত হয় সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন শান্তিবাহিনী। ১৯৭৬ সালে বরকলে টহল পুলিশের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করা এই সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনের। সংগঠনটির সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য বিশ্বস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব না থাকায় সশস্ত্র আন্দোলন এক পর্যায়ে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠে। শান্তিবাহিনীর অব্যাহত সশস্ত্র হামলার মধ্যেই তৎকালীন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার তৎপরতাকে রুখতে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই সমতল থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভূমিহীন এবং দরিদ্র বাঙালিকে পুনর্বাসন করেন পাহাড়ে।

এতে বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা কমলেও নতুন সমস্যা হিসেবে চলে আসে ভূমি বিরোধ। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশাল ভূখন্ড হলেও এখানে বসবাস এবং চাষ উপযোগী জমির পরিমান কম। তার উপর ১৯৬০ সালে নির্মিত কাপ্তাই বাঁধের কারণে প্রায় এক লক্ষ একর ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় ব্যবহারযোগ্য ভূমির পরিমাণ কমেছে। ফলে নতুন করে পূনর্বাসন পাহাড়ে জটিলতা বাড়ায়, বাড়ে মানবিক সংকটও। সেই সাথে শান্তিবাহিনীর একের পর এক হামলায় প্রাণ হারাতে থাকেন এইসব দরিদ্র পুনবার্সিত বাঙালিরা। বাস্তবতার কারণেই এই বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে পাহাড়ে বাড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি। শান্তিবাহিনীর হাতে অসংখ্য বাঙালির প্রাণ হারানোর ঘটনায় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পাহাড়িদের ওপর ক্ষুব্ধ বাঙালিদের হামলার ঘটনাও বাড়তে থাকে। ক্রমশ নষ্ট হতে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি-বাঙালির সম্পর্ক।

এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে আশির দশকের দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক তিনটি জেলায় রূপান্তর করা হয়। শুরু হয় নতুন তিনটি প্রশাসনিক জেলার। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর শান্তিবাহিনীর একটি অংশের হাতে নিহত হন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও জুম্ম জাতীয়তাবাদের জনক হিসেবে পরিচিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এমএন লারমা)। তার মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন তারই ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। অব্যাহত থাকে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণ। এসব আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলো পুনবার্সিত বাঙালি গ্রাম, সেনাবাহিনী-পুলিশ-আনসার সদস্যরা। শান্তিবাহিনীর হামলায় ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ঠিক কতজন বাঙালি কিংবা নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য মারা গেছেন তার সত্যিকারের নিরপেক্ষ কোন গবেষণা না হলেও বিভিন্ন গবেষকরা এই সংখ্যাকে অন্তত দশ হাজার বলে দাবি করে থাকেন। এদের মধ্যে সবচে বড় ঘটনাটি ছিলো বরকলের ভূষণছড়ায় একরাতেই চারশ জন বাঙালিকে হত্যার ঘটনা। একই সময় জাতিগত জিঘাংসায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত এক হাজার সাধারণ পাহাড়ি মানুষ। তবে দুটিক্ষেত্রেই কোন বিশ্বস্ত কিংবা দায়িত্বশীল সূত্র পাওয়া সম্ভব হয়নি।

শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতা চলমান থাকা অবস্থাতেই এরশাদ সরকারের আমলে প্রথম তাদের সাথে আলোচনা শুরু হয়। সেই সময় বেশকিছু শান্তিবাহিনী সদস্য আত্মসমর্পণ করে এবং গঠন করা হয় স্থানীয় সরকার পরিষদ। কিন্তু বন্ধ হয়নি শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী তৎপরতা। এরশাদের পরে বিএনপি সরকারের আমলেও শান্তিবাহিনীর সাথে শুরু হয় সংলাপ। এই সংলাপে নেতৃত্ব দেন তৎকালিন যোগাযোগমন্ত্রী কর্নেল (অব) অলি আহমেদ।

তবে পাহাড়ের সংকট সমাধানে আলোচনার পথে সংগঠনটি পা বাড়ান দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারি বঙ্গবন্ধুর দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর। শুরু হয় আলোচনা বৈঠক, মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে প্রায় দুই হাজার সশস্ত্র বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর সদস্যকে সাথে নিয়ে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন সন্তু লারমা। চুক্তির মাধ্যমে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ। স্থানীয় সরকার পরিষদের বদলে হয় পার্বত্য জেলা পরিষদ। আত্মসমর্পণকারী শান্তিবাহিনীর সদস্যদের প্রায় আটশত জন ফিরে যান সরকারি চাকুরিতে। বাকীদের নানাভাবে পুনর্বাসন করা হয়। শান্তিবাহিনীর রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি প্রকাশ্য রাজনৈতিক দল হিসেবে তৎপরতা শুরু করে।

অন্যদিকে বিএনপি-জামাত এবং বাঙালি ভিত্তিক সংগঠনগুলো চুক্তির বিরোধিতা করে নানান কর্মসূচি পালন করেন। আবার চুক্তির বিরোধিতা করে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে চুক্তিকে কালো পতাকা দেখিয়ে জনসংহতি সমিতির সহযোগী ছাত্র সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের একটি অংশ গঠন করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।

২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার পরাজিত হলে চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কিছু বাধাপ্রাপ্ত হয়। থমকে যায় বাস্তবায়ন কার্যক্রম। চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠে সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।

২০০৬ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হলে গঠিত হয় অন্তবর্তীকালিন সরকার। সেই সরকারে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দায়িত্ব পান চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়। সেই সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ভাঙ্গন দেখা দেয়।

শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং ইউপিডিএফ এর মধ্যে যে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত চলছিলো তাতে নতুন করে যুক্ত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)। সংগঠটির কেন্দ্রীয় নেতা রূপায়ন খীসা, তাতিন্দ্রলাল চাকমা পেলে, সুধাসিন্ধু খীসার নেতৃত্বে ২০১০ সালে গঠিত হয় পাহাড়ের নতুন আরেকটি আঞ্চলিক সংগঠন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)’।

ত্রিপক্ষের বিরোধ আরো বেড়ে যায়, এসময় প্রাণ হারায় আঞ্চলিক দলের অনেক নেতাকর্মী। একই সময়ে পাহাড়ের এই তিন আঞ্চলিক দলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং অপহরণ বাণিজ্যের অভিযোগ আছে। যদিও তারা সবসময়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনে আর আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়নি জনসংহতি সমিতি। তারা নিজেরাই প্রার্থী দেয় এবং পরাজিত হয়। কিন্তু এই নির্বাচন থেকেই আওয়ামীলীগের সাথে তাদের রাজনৈতিক বিরোধ শুরু হয়, যা এখনো চলমান। বিশেষত এই বিরোধের মূল কারণ হয়ে উঠে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং ভূমি বিরোধ।

সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন জনসংহতি সমিতির নিজস্ব প্রার্থী ঊষাতন তালুকদার। আবার উপজেলা নির্বাচনে রাঙামাটির দশটি উপজেলার মধ্যে ছয়টি এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৪৯ টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩৩ টিতেই বিজয়ী হয় আঞ্চলিক দলগুলো।

তবে অন্যদিকে আঞ্চলিক দলগুলোর রাজনৈতিক এই তৎপরতা ও ভূমি বিরোধের কারণে সংশয়ে আছে পাহাড়ে বসবাসকারি বাঙালীরা। ভূমি কমিশনের কার্যক্রমের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়তে হবে এমন আশঙ্কায় ইতোমধ্যেই বাঙালী সংগঠনগুলোর ডাকে একাধিকবার হরতাল অবরোধ সহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

জেএসএস’র ও ইউপিডিএফ’র পতাকা

জেএসএস ও ইউপিডিএফ’র পতাকা

আঞ্চলিক তিন দলের মধ্যে জেএসএস (এমএন লারমা) সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস থেকে বেরিয়ে আসার ফলে প্রথমে ইউপিডিএফ ও জেএসএস (এমএন লারমা) গ্রুপের মধ্যে ভালো সম্পর্ক থাকলেও তা আধিপত্য বিস্তার সহ নানান কারণে বেশিদিন এ সম্পর্ক টিকে থাকতে পারেনি।

এরই মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইউপিডিএফ (প্রসিত) ও জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) মধ্যে বন্ধুত্ব যখন শত্রুতায় রূপ নিচ্ছিল, তখনই সন্তু লারমার নেতৃত্বধীন পর্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস)’র চিরশত্রু প্রসিত খীসার নেতৃত্বধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট এর মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হয়। ১৯৯৭ সালের পর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই দুই সংগঠন পাল্টাপাল্টি হামলায় অন্তত ১ হাজার নেতাকর্মী নিহত হলেও এই বিরল সমঝোতার পর আর কোনো সংঘাত হয়নি দুই পক্ষের। এই নতুন সমঝোতার কারণে ইউপিডিএফ (প্রসিত) সঙ্গে তার পুরনো বন্ধু জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) দূরত্ব আরো তৈরি হতে থাকে।

 

পরর্বর্তীতে গত ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর ইউপিডিএফ (প্রসিত) থেকে বহিষ্কৃত ও বেরিয়ে যাওয়া নেতাকর্মীদের একটি অংশ তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মার নেতৃত্বে পৃথক ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-গনতান্ত্রিক) নামে পৃথক আরেকটি দল গঠন করে। নতুন এই দলটির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএনলারমা) দলের সঙ্গে। ফলে পাহাড়ের রাজনীতিতে আসে নয়া মেরুকরণ।

আঞ্চলিক চারটি দলে রূপান্তর হয় পাহাড়ের মানুষ। বিরল এক সমঝোতার মাধ্যমে যখন সন্তু লারমার নেতৃত্বধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-সন্তু) ও প্রসিত খীসার নেতৃত্বধীন ইউপিডিএফ (প্রসিত)’র সর্ম্পক বন্ধুত্বে রূপ নেয়। ঠিক তখনই পুরনো এই দুই সংগঠন থেকে বেরিয়ে যাওয়া আলাদা আরো দুই সংগঠন তপন জ্যোতি বর্মা নেতৃত্বধীন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও সুধাসিন্ধু খীসার নেতৃত্বধীন জেএসএস (এমএন লারমা) মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। নয়া এ মেরুকরণের পর থেকে পাহাড়ে ইউপিডিএফ (প্রসিত) নেতাকর্মীদের ওপর শুরু হয় একের পর এক হামলা। বিভিন্ন হামলায় ইউপিডিএফ (প্রসিত) দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা মিঠুন চাকমা সহ আরো অনেকে নিহত হয়।

পাহাড় থেকে বিভিন্ন সময় যৌথ বাহিনীর অভিযানে উদ্ধাকৃত অস্ত্র।

পাহাড় থেকে বিভিন্ন সময় যৌথ বাহিনীর অভিযানে উদ্ধাকৃত অস্ত্র।

একদিকে নানিয়ারচরে নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে জনসংহতি সমিতির (এমএনলারমা) শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমা চাকমার ওপর ক্ষোভ। অপরদিকে তপন জ্যোতি চাকমা বর্মার নেতৃত্বে থাকা ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) কর্মীদের হাতে একের পর এক নেতাকর্মী হত্যার জন্য তপন জ্যোতি চাকমার ওপর ক্ষোভ চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে যায় ইউপিডিএফ (প্রসিত) গ্রুপের।

এর মধ্যেই গত মার্চ মাসে ইউপিডিএফ’র সহযোগী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের শীর্ষ দুই নেত্রী দয়াসোনা চাকমা ও মন্টি চাকমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় তপন জ্যোতি চাকমার ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। দীর্ঘ প্রায় এক মাস এক দিন পরে এই দুই নেত্রী মুক্তি পায়। এসকল ঘটনার কারণে শক্তিমান চাকমা ও তপন জ্যোতি চাকমা হয়ে উঠে ইউপিডিএফ (প্রসিত)’র মূল শত্রু ।

এর ফলে চলতি বছরের ৩ মে নিজ অফিসের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেএসএস (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় সভাপতি শক্তিমান চাকমাকে। এর ২৪ ঘন্টা না পেরুতেই শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়া অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফ (প্রসিত)’র অন্যতম শত্রু তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাকে। এ ঘটনায় যদিও দুই নেতার দুই সংগঠন থেকে ইউপিডিএফ (প্রসিত) কে দায় করা হয়েছে। কিন্তু ইউপিডিএফ (প্রসিত) দায় অস্বীকার করেন।

সর্বশেষ গত ১৮ মার্চ  উপজেলা পরিষদ কেন্দ্র করে ঐদিন অনুষ্ঠিত নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সদস্যরা দায়িত্ব পালন শেষ করে সাজেকের তিনটি ভোটকেন্দ্র থেকে ভোট বাক্সসহ বাঘাইছড়িতে ফিরছিলেন নির্বাচনি কাজে নিয়োজিত প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারসহ নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সর্বমোট ৮জন নিহত হয়। চারটি গাড়িতে করে বাঘাইছড়ি ফেরার পথে নয়মাইল এলাকায় তাদের ওপর সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। অন্যদিকে বাঘাইছড়িতে হামলার ১২ঘন্টার মাথায় বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চগ্যাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

বাঘাইছড়িতে দুর্বৃত্তের গুলিতে প্রিসাইডিং অফিসারসহ নিহত

বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে প্রিসাইডিং অফিসারসহ নিহত ৭ জন।

পাহাড়ে ২ বছরে প্রায় একশত খুন:
পাহাড়ের রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে বছরের পর বছর হাজারো মানুষ মারা গেলেও গত বেশ কয়েক বছর ধরে পাহাড় ছিলো শান্ত। কিন্তু ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে আবারো পাহাড়ে শুরু হয় অস্থিরতা। গত ১০ মাসে পাহাড়ে আবারো ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষে সর্বশেষ ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাণ যায় অন্তত ৪০ জনের, অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত প্রাণ যায় ১০-১৫জনের। পাহাড়ের এই মেরুকরণের অন্যতম কারণ হিসাবে আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজি অন্যতম হিসেবে দেখছেন সুশীল সমাজ।

বাংলাদেশ মানবাধিকার’র সদস্য বাঞ্ছিতা চাকমা বলেন, পাহাড়ের সুন্দরতম পরিবেশকে দিনে দিনে বিষাক্ত করে দিচ্ছে কিছু মহল। সম্প্রতির এই পাহাড় এখন শত্রুতায় রূপান্তর হয়েছে। নিজেদের মধ্যকার কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির কারণে এ দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে এবং পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন নতুন বাঁক সৃষ্টি হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে পাহাড়ের রাজনৈতিতে নানান মেরুকরণ।

রাঙামাটির প্রবীন সংবাদিক সুনীল কান্তি দে বর্তমান পাহাড়ের রাজনৈতি অস্থিরতা প্রসঙ্গে বলেন, প্রথম যখন পাহাড়ে সংগঠন হয়েছিল তখন এখানে আন্তর্জাতিক ছোয়া ছিল। দ্বিতীয় সংগঠনের সময় তারা ভাগ হওয়ার পরে এদিক সেদিক ঘুরাফেরা করে, কারো না কারো ছোয়া নিয়ে, কারো না কারো আশির্বাদ নিয়ে, সংগঠনগুলো টিকে আছে বলে আমরা মনে করি। কিন্তু চারটি আঞ্চলিক সংগঠন যখন হলো তখন বুঝা গেল যে, না তারা কারো না কারো অস্ত্র হিসাবে কাজ করছে। কারো হাতের হয়ে কাজ করা আর কারো আন্তর্জাতিক লিংক নিয়ে কাজ করা এক জিনিস নয়, এটা আমাদের বুঝতে হবে।

অন্যদিকে আঞ্চলিক দলগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালি, জেএসএস মূল দলসহ অন্যদের দাবি, ভ্রান্ত ধারণা এবং ব্যক্তি স্বার্থেই মূল জেএসএস ভেঙ্গে এখন চারটি সংগঠন। যাদের পেছনে কাজ করছে রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি। জেএসএস সংগঠনগুলোর নেতারা করেন, ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন যাতে যথাযতভাবে বাস্তবায়ন না হয়, এই ধরনের একটা প্রচেষ্টা, কোন কোন সময় ষড়যন্ত্র, সব সময় এখানে কাজ রয়েছে। এসব সরকারের মহল ও সরকারের বাহিরের মহল জড়িত আছে বলে তারা মনে করি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ মানবধিকার কমিশনের সাবেক কমিশনার নিরুপা দেওয়ান বলেন, শান্তি চুক্তি ববাস্তবায়িত না হওয়ায় হতাশা থেকে এবং কিছু মানুষের প্ররোচনায় এসব ঘটনা ঘটছে। আমরা পাহাড়ে সংঘাত চাই না, শান্তি চাই। শান্তি প্রতিষ্ঠায় আঞ্চলিক দল এবং সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সংঘাত যে কোন উপায়ে বন্ধ করতে হবে।

পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাঙামাটি জেলা আইনজীবি সমমিতির নেতারা বলেন, অবৈধ অস্ত্র এবং অবৈধ চাঁদার ব্যবস্থা বন্ধ করতে পারলেই এই হত্যা কান্ড অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে।

সরকারের স্বদিচ্ছা থাকলে বিবাদমান পক্ষগুলোই পাহাড়ে সংঘাত বন্ধ করতে পারে। তবে তার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, আঞ্চলিক সংগঠনগুলোতো কোন অবৈধ সংগঠন নয়। তারা সবসময় নির্বাচন করছে। তাহলে যেহেতু তাদের কোন নেতৃত্ব আছে সেহেতু তাদেরকে নিয়ে সরকার উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক করে তাদের সাথে একটা সমঝোতার বৈঠক করার প্রয়োজন আছে বলে তারা মনে করেন।

জনসংহতি সমিতির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২ ডিসেম্বর এই চুক্তি স্বাক্ষর

জনসংহতি সমিতির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২ ডিসেম্বর এই চুক্তি স্বাক্ষর

অন্যদিকে স্থানীয় শীর্ষ আওয়ামীলীগ নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন যাবৎ আমরা বলে আসছি, পাহাড় থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্রধারিদের নির্মূল করা হোক। একজন উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ৬জন এবং অনেক পাহাড়ী-বাঙালীকে প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে এইভাবে হত্যা করার পর এখনো কি আমরা চুপ করে থাকবো? এখনো কি আমরা অপেক্ষা করবো ? তারা মনে করেন, এখন সঠিক সময়, এদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে অবৈধ অস্ত্রমুক্ত করার।

এদিকে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ মনে করেন, পাহাড়ের প্রণঘাতি সংঘাত বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছে পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ। পাহাড়ের বিবাদমান পক্ষগুলোর জের ধরে গেল এক বছরে প্রাণ গেল প্রায় একশত জনের মত। এই বিরোধ অচিরেই মেটানো না গেলে কিংবা উদ্দ্যোগ না গেলে সবুজ শ্যামল শান্ত পাহাড় আবারো অশান্ত হয়ে উঠবে। বর্তমানে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে বড় ধরনের রাজবনৈতিক অস্থিরতা কিংবা সহিংসতার জন্ম হতে পারে বলে ধারণা করছেন পাহাড়ের শান্তি প্রিয় মানুষ।

‘‘পার্বত্য অঞ্চলের জন্ম থেকে জন্মাতরে, যুগ থেকে যুগান্তরে’’ চলা এই সহিংসতা কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা বন্ধ হয়ে, পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের্র সবুজ পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বয়ে আসুক। এমন প্রত্যাশায় করেন, পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ী-বাঙালী সব সম্প্রদায়ের মানুষ।

সহযোগিতায় দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার রাঙামাটি জেলা প্রতিনিধি সাইফুল বিন হাসান।

সংবাদটি শেয়ার করুন
খবরটি প্রিন্ট করুন খবরটি প্রিন্ট করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 cht-breakingnews.com
Developed BY Jyoti